হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
ভূমিকা
বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সময় অতিক্রম করছে। একদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি মানবসভ্যতাকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেওয়ার দাবি করছে, অন্যদিকে একই সভ্যতার বুকে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে হিংসা, বিভাজন ও মানবিকতার অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। আজকের পৃথিবী যেন উন্নত হলেও নিরাপদ নয়, সংযুক্ত হলেও সহানুভূতিশীল নয়। ফলে প্রশ্ন জাগে-মানবসভ্যতা আসলে কোন পথে অগ্রসর হচ্ছে?
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ, দমন-পীড়ন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত মানবতার মৌলিক ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান সহিংসতা ও নিধন বিশ্ব বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। কোথাও ধর্মীয় বিভাজনের নামে, কোথাও রাজনৈতিক আধিপত্যের অজুহাতে, আবার কোথাও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মাধ্যমে মানুষ মানুষকে ধ্বংস করছে। ধর্ম, জাতি ও পরিচয়কে হাতিয়ার বানিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে যে নিষ্ঠুর রাজনীতি চলছে, তা আজ আর গোপন নয়।
এই সহিংসতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনোজগৎ ও সামাজিক আচরণে। প্রতিদিন গণমাধ্যমে ভেসে ওঠা লাশ, কান্না ও ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য আমাদের অনুভূতিকে এমনভাবে অসাড় করে তুলেছে যে মৃত্যু আজ একটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মমতা-যেগুলো মানুষকে মানুষ করে তোলে-সেগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
স্বার্থপরতা আজ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র-সব স্তরের চিন্তার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্যের জীবন, অধিকার ও মর্যাদাকে তুচ্ছ করে দেখার মানসিকতা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আপন-পরের সীমারেখা ভেঙে পড়ছে, ন্যায় ও অন্যায়ের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। এভাবে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে।
এই প্রবন্ধে বর্তমান বিশ্বের এই সংকটময় বাস্তবতা-সহিংসতা, বিভাজন ও মানবিকতার অবক্ষয়-বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি উত্তরণের সম্ভাব্য পথও অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা হবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানবসভ্যতা টিকে থাকে শক্তিতে নয়, টিকে থাকে ন্যায়, ভালোবাসা ও বিবেকের ওপর ভর করে। এখন প্রশ্ন একটাই-আমরা কি সেই পথে ফিরতে প্রস্তুত?
দিশাহীন বর্তমান বিশ্ব: কোন পথে মানবসভ্যতা?
বর্তমান যুগকে প্রায়ই বলা হয় উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্ময়কর উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। তবুও এই অগ্রগতির মাঝেই মানবসভ্যতা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। আজ প্রশ্ন উঠছে-এই সভ্যতা আসলে কোন পথে হাঁটছে? উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেও কেন মানুষ দিশাহীন?
এক সময় মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনার বিকাশ সমান্তরালে চলত। কিন্তু বর্তমান যুগে উন্নয়নের মানদণ্ড প্রায় সম্পূর্ণভাবে বস্তুগত সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত আধিপত্য-এসবই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের সাফল্যের মাপকাঠি। এর ফলে মানবিকতা, সহানুভূতি ও নৈতিকতার মতো মৌলিক গুণাবলি ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে।
আজকের মানুষ দ্রুত এগোতে চায়, কিন্তু কোথায় পৌঁছাতে চায়-তা স্পষ্ট নয়। জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে ভোগ, ক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে মানুষ মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে, সহযাত্রী হিসেবে নয়। ফলস্বরূপ সমাজে বাড়ছে হিংসা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব স্তরেই এই মানসিকতার প্রভাব লক্ষ করা যায়।
বিশ্ব রাজনীতির দিকেও তাকালে দিশাহীনতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, যুদ্ধ ও সংঘাতকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করছে। মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায়ই রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বে শান্তির পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।
নৈতিক অবক্ষয়ের আরেকটি দিক হলো মানুষের অনুভূতিহীনতা। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে মৃত্যু, যুদ্ধ ও ধ্বংসের খবর দেখেও আমরা প্রায় নির্বিকার থাকি। অন্যের কষ্ট আমাদের আর গভীরভাবে নাড়া দেয় না। এই মানসিক অবসন্নতাই প্রমাণ করে যে, সভ্যতা যত এগোচ্ছে, মানুষের হৃদয় ততই শূন্য হয়ে পড়ছে।
তবে এই দিশাহীনতা চিরস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংকটের মধ্য দিয়েই মানবসভ্যতা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে। বর্তমান সময়েও প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং মানবিক মূল্যবোধে ফিরে আসা। উন্নয়নের সঙ্গে যদি ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবপ্রেম যুক্ত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।
অতএব, প্রশ্নটি শুধু “আমরা কতদূর এগিয়েছি” নয়, বরং “আমরা কোন পথে এগোচ্ছি”। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই বর্তমান মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও মুসলিম নিধনের বাস্তবতা
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে এক নির্মম বাস্তবতা চোখে পড়ে-পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম জনগোষ্ঠী নানাভাবে সংঘাত, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কখনো ধর্মীয় বিভাজনের নামে, কখনো রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে, আবার কখনো একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই সংঘর্ষ সৃষ্টি করে মুসলমানদের দুর্বল ও বিভক্ত করে রাখা হচ্ছে। এই বাস্তবতা শুধু কোনো একটি অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা আজ একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
অনেক দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে ধর্মীয় বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়কে অপরাধে পরিণত করে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। কোথাও মসজিদ ধ্বংস করা হচ্ছে, কোথাও ধর্মীয় পোশাক ও আচার পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবাধিকারের যে আদর্শ বিশ্বব্যাপী প্রচার করা হয়, বাস্তবে তা প্রায়ই মুসলমানদের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে।
অন্যদিকে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশেই যুদ্ধ, গৃহসংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এসব সংঘাতের পেছনে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্ষমতা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য মুসলিম দেশগুলোকে প্রায়শই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত, আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো-মুসলিম বনাম মুসলিম সংঘাত। একই কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া মানুষই আজ একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে। মতাদর্শ, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে সামনে রেখে মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা হয়েছে। এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বহির্শক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে, আর মুসলিম বিশ্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুসলমানদের প্রায়ই সন্ত্রাসের সঙ্গে একাকার করে উপস্থাপন করা হয়। কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনাকে পুরো মুসলিম সমাজের পরিচয় হিসেবে দাঁড় করানো হয়, যা ইসলামভীতি (Islamophobia) আরও উসকে দেয়। এর ফলে সাধারণ মুসলমানরা সন্দেহ, ভয় ও ঘৃণার শিকার হয়, যদিও তারা নিজেরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার।
এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, মুসলিম নিধন বা মুসলমানদের ওপর সংঘাত কেবল কোনো ধর্মীয় সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক সংকট। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো যদি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে এই সহিংসতা ও নিপীড়ন থামবে না।
অতএব, বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও মুসলিম নিধনের এই বাস্তবতা আমাদের শুধু শোকাহতই করে না, বরং গভীর আত্মসমালোচনারও আহ্বান জানায়। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, সচেতনতা ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে-মানবতার প্রশ্নে দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো।
ধর্ম ও পরিচয়ের নামে হিংসার রাজনীতি
ধর্ম মানুষের আত্মিক শান্তি, নৈতিকতা ও মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। অথচ আধুনিক বিশ্বের এক নির্মম বাস্তবতা হলো-এই ধর্মই আজ অনেক ক্ষেত্রে হিংসা, বিভাজন ও রক্তপাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হিন্দু-মুসলিম, খ্রিস্টান-মুসলিম কিংবা মুসলিম বনাম মুসলিম-ধর্ম ও পরিচয়ের নামে সংঘাতকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, যার নেপথ্যে প্রকৃতপক্ষে কাজ করছে ক্ষমতা, আধিপত্য ও রাজনৈতিক স্বার্থের নির্মম খেলা।
ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিচয়গুলোর একটি। এই সংবেদনশীলতাকেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো কাজে লাগায়। জনগণের প্রকৃত সমস্যা-দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও ন্যায়বিচার-থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে ধর্মীয় বিভাজনকে উসকে দেওয়া হয়। এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যাতে মানুষ প্রশ্ন করার বদলে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়।
বিশ্বের বহু দেশে আমরা দেখি, সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘু বিভাজনের মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও মুসলমানরা সংখ্যালঘু হওয়ায় নিপীড়নের শিকার, আবার কোথাও খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই সংঘাতের মূল কারণ ধর্ম নয়, বরং ক্ষমতার লড়াই। ধর্ম কেবল একটি মুখোশ, যার আড়ালে চলছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো মুসলিম বনাম মুসলিম সংঘাত। একই বিশ্বাস, একই ধর্মগ্রন্থ ও একই নবীর অনুসারী হয়েও মতাদর্শ, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণে মুসলমানরা একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরছে। এই বিভাজন মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং বহির্শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের পথ আরও সহজ করেছে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও অনেক ক্ষেত্রে এই হিংসার রাজনীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও উস্কানিমূলক প্রচারণা মানুষের আবেগকে উত্তপ্ত করে তোলে। যুক্তি ও সংলাপের জায়গায় স্থান নেয় সন্দেহ, ভয় ও ঘৃণা। ফলে সহাবস্থানের পরিবর্তে সংঘাতই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক বাস্তবতা।
অথচ ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষা স্পষ্টভাবে বলে-ধর্ম কখনোই হিংসার অনুমোদন দেয় না। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম-সব ধর্মই ন্যায়, সহনশীলতা ও মানবপ্রেমের কথা বলে। কিন্তু যখন ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রাধান্য পায়, তখন ধর্ম তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও বিবেকের জাগরণ। মানুষকে বুঝতে হবে-তার প্রকৃত শত্রু অন্য ধর্মের মানুষ নয়, বরং সেই শক্তি যারা ধর্মকে ব্যবহার করে তাকে বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখে। ধর্মকে যদি আবার মানবিকতা, ন্যায় ও শান্তির পথে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে হিংসার এই রাজনীতি টিকে থাকতে পারবে না।
স্বার্থপরতার চূড়ান্ত রূপ: আপন-পরের সীমারেখা ভেঙে পড়া
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সম্পর্কের ইতিহাস-পরিবার, সমাজ ও জাতির মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহমর্মিতার ইতিহাস। কিন্তু বর্তমান যুগে সেই সম্পর্কের ভিত্তিই যেন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বার্থ এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানবিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে, আপন মানুষ পর হয়ে যাচ্ছে, আর স্বার্থের কারণে পর মানুষ আপন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
এক সময় আপন-পরের ধারণা গড়ে উঠত ভালোবাসা, দায়িত্ব ও নৈতিকতার ওপর। পরিবারে আত্মত্যাগ ছিল স্বাভাবিক, সমাজে ছিল পারস্পরিক সহানুভূতি। আজ সেই জায়গায় স্থান নিয়েছে হিসাব-নিকাশ ও লাভ-ক্ষতির মানসিকতা। মানুষ এখন সম্পর্ক বিচার করে-কে কতটা উপকারে আসবে, কে কতটা লাভ এনে দেবে। যেখানে স্বার্থ নেই, সেখানে সম্পর্কও টেকে না।
এই স্বার্থপরতা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; তা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্তরেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থের অজুহাতে অন্য দেশের মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে তুচ্ছ করে দেখছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ-সবকিছুই ন্যায্য বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে কেবল “স্বার্থ” শব্দটির আড়ালে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে, অথচ বিবেক যেন নির্বিকার।
সামাজিক স্তরে এই স্বার্থপরতার প্রতিফলন আরও ভয়াবহ। প্রতিবেশীর কষ্ট প্রতিবেশী দেখে না, পথের পাশে অসহায় মানুষ পড়ে থাকলেও অধিকাংশ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ ও সহমর্মিতার বাহুল্য থাকলেও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুব কম। মানুষের হৃদয়ে যেন এক অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো-স্বার্থপরতার কারণে নৈতিকতার মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে। অন্যায়কে অন্যায় বলা হয় তখনই, যখন তা নিজের স্বার্থে আঘাত করে। আপন মানুষ ভুল করলে তা ঢেকে রাখা হয়, আর স্বার্থসংশ্লিষ্ট পর মানুষ উপকারী হলে তার অন্যায়ও ক্ষমাযোগ্য হয়ে ওঠে। এভাবেই ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ সম্পর্কহীন মানুষ একা, আর একাকিত্ব থেকে জন্ম নেয় ভয়, সন্দেহ ও হিংসা। সমাজ যদি কেবল স্বার্থের ওপর দাঁড়ায়, তবে সেখানে মানবিকতা টিকে থাকতে পারে না।
এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে ফিরে আসা। স্বার্থের সঙ্গে দায়িত্ববোধ, লাভের সঙ্গে সহমর্মিতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বিচার যুক্ত না হলে মানবসভ্যতা আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে। আপন-পরের বিভাজন নয়, বরং মানুষে মানুষে সম্পর্কই হওয়া উচিত আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।
লাশের সারি ও হারিয়ে যাওয়া মানবিকতা
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে-চারদিকে ছড়িয়ে থাকা লাশ, কান্না, ধ্বংসস্তূপ আর নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এক সময় যেসব দৃশ্য মানবজাতিকে গভীরভাবে আলোড়িত করত, আজ সেগুলো যেন নিত্যদিনের সাধারণ খবরে পরিণত হয়েছে। মৃত্যু এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা।
যুদ্ধ, সন্ত্রাস, দাঙ্গা ও সংঘাতে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে অসংখ্য নিরীহ প্রাণ। শিশু, নারী, বৃদ্ধ-কারোই রেহাই নেই। রক্তে ভেজা রাস্তাঘাট, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং উদ্বাস্তু মানুষের সারি আজ বিশ্বমানবতার মুখে এক নির্মম প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে-আমরা কি সত্যিই সভ্য?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এসব দৃশ্য আমাদের আর ততটা নাড়া দেয় না। টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেসে ওঠা লাশের ছবি আমরা দ্রুত স্ক্রল করে এগিয়ে যাই। অন্যের কষ্ট যেন আমাদের জীবনের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখে না। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সহমর্মিতা ও মমতা।
ভালোবাসা ও মানবিকতা যেখানে মানুষের মৌলিক পরিচয় হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ নিষ্ঠুরতা ও উদাসীনতা স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। মানুষ মানুষকে সংখ্যা হিসেবে দেখছে-মৃতের সংখ্যা, আহতের সংখ্যা, উদ্বাস্তুর সংখ্যা। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে একটি করে জীবন, একটি করে পরিবার ও অসংখ্য স্বপ্ন ছিল-সেটা আমরা ভুলে যাচ্ছি।
এই অনুভূতিহীনতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সহিংসতার অভ্যাস। যখন চারদিকে বারবার রক্তপাত ঘটে, তখন মানুষ মানসিকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে সে নিজের চারপাশের কষ্ট এড়িয়ে চলতে শেখে। কিন্তু এই আত্মরক্ষামূলক উদাসীনতাই ধীরে ধীরে মানবিকতার মৃত্যু ডেকে আনে।
মানবিকতা হারিয়ে গেলে সমাজ টিকে থাকে কেবল কাঠামো হিসেবে-হৃদয় ছাড়া এক দেহের মতো। সেখানে আইন থাকতে পারে, শাসন থাকতে পারে, উন্নয়ন থাকতে পারে; কিন্তু ন্যায়, করুণা ও ভালোবাসা থাকে না। আর এমন সমাজে শান্তি কখনো স্থায়ী হতে পারে না।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। এখনো এমন মানুষ আছে, যারা অন্যের কষ্টে কাঁদে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং মানবতার পক্ষে কথা বলে। প্রয়োজন এই মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং মনে করিয়ে দেওয়া-একটি মানুষের জীবন পুরো পৃথিবীর সমান মূল্যবান।
লাশের সারি নয়, ভালোবাসার সারিই হওয়া উচিত মানবসভ্যতার পরিচয়। মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে উন্নতি, সভ্যতা ও প্রযুক্তি-সবই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
উত্তরণের পথ: মানবিকতা, ন্যায় ও বিবেকের পুনর্জাগরণ
মানবসভ্যতা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুরতার চাপে মানুষের অন্তর ক্রমশ শূন্য হয়ে পড়ছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়-সবচেয়ে অন্ধকার সময়েই নতুন আলোর সন্ধান শুরু হয়। বর্তমান সংকট থেকেও উত্তরণের পথ রয়েছে, যদি মানুষ আবার মানবিকতা, ন্যায় ও বিবেকের দিকে ফিরে আসে।
এই উত্তরণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে-ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে। প্রতিটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সমান-এই বোধ যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে কোনো শান্তি স্থায়ী হতে পারে না। সহমর্মিতা ও করুণাই হতে হবে আমাদের চিন্তা ও আচরণের মূল ভিত্তি।
ন্যায়বিচার ছাড়া মানবিকতা অর্থহীন। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র-সব স্তরেই ন্যায়ের চর্চা অপরিহার্য। শক্তিশালী ও দুর্বল, আপন ও পর-সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে না পারলে ন্যায় কেবল একটি শ্লোগানে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবি।
ধর্মের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম যদি রাজনীতির হাতিয়ার না হয়ে নৈতিকতার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে, তবে তা মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। সব ধর্মই ভালোবাসা, ক্ষমা ও মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। এই মূল শিক্ষাগুলোকে সামনে আনতে হবে, বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যাখ্যাগুলোকে নয়।
সহনশীলতা ও সংলাপও উত্তরণের অপরিহার্য উপাদান। মতভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু তা সংঘাতের কারণ হওয়া উচিত নয়। সংলাপ, বোঝাপড়া ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র-সব পর্যায়েই এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিবেকের জাগরণ। অন্যায়কে অন্যায় বলে স্বীকার করার সাহস, নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা এবং সত্যের পক্ষে কথা বলার নৈতিক শক্তি-এসবই বিবেকের পরিচয়। যদি প্রতিটি মানুষ নিজের অবস্থান থেকে এই দায়িত্ব পালন করে, তবে পরিবর্তন অনিবার্য।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি ঘৃণা, হিংসা ও স্বার্থপরতার পথ বেছে নিই, তবে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হবে। আর যদি মানবিকতা, ন্যায় ও ভালোবাসার পথে ফিরি, তবে এই সংকটই একদিন মানবতার নবজাগরণের সূচনা হয়ে উঠবে।
ফলাফল
সমগ্র আলোচনার প্রেক্ষিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে বর্তমান বিশ্ব এক গভীর নৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দিশাহীনতা, সংঘাত, ধর্ম ও পরিচয়ের নামে হিংসা, চরম স্বার্থপরতা এবং লাশে ভরা বাস্তবতা-সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা আজ এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেও মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিকতার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে চলমান সহিংসতা, বিশেষত মুসলিম নিধনের বেদনাদায়ক বাস্তবতা, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে শক্তি ও স্বার্থের রাজনীতি কীভাবে মানবজীবনের মূল্যকে তুচ্ছ করে তুলেছে। ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার বানিয়ে মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, যার ফলে ভেঙে পড়ছে সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক বিশ্বাস।
একই সঙ্গে স্বার্থপরতার চূড়ান্ত রূপ মানবিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিয়েছে। আপন-পরের সীমারেখা ভেঙে পড়েছে, ন্যায় ও অন্যায়ের মানদণ্ড ঝাপসা হয়ে গেছে। লাশ, কান্না ও ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য আমাদের হৃদয়কে এমনভাবে অসাড় করে তুলেছে যে সহমর্মিতা ও মমতা আজ বিরল গুণে পরিণত হয়েছে।
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যেই আশার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়নি। মানবিকতা, ন্যায় ও বিবেকের পুনর্জাগরণই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলেই সমাজে শান্তি ও সহাবস্থানের ভিত্তি পুনর্নির্মিত হবে।
অতএব বলা যায়, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত চেতনা ও নৈতিক সাহসের ওপর। যদি আমরা নীরব থাকি, অন্যায় আরও শক্তিশালী হবে; আর যদি বিবেকের ডাককে গুরুত্ব দিয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়াই, তবে এই সংকটই একদিন ন্যায়, শান্তি ও ভালোবাসাভিত্তিক নতুন বিশ্বের সূচনা করবে।
লেখা: মজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট